মাদারগঞ্জে দুই মাসে ২৬ ট্রান্সফরমার চুরি, বিদ্যুৎহীন বহু পরিবার
বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-10 12:39:00 · স্টাফ রিপোর্টার
জামালপুরের মাদারগঞ্জে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা। গত দুই মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। চুরির পর নতুন সংযোগ স্থাপনে অতিরিক্ত অর্থদণ্ড ও বিলম্বের কারণে চরম ভোগান্তি ও বিদ্যুৎহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন কয়েকশ পরিবার। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক টাকা গ্রাহকদের জমা দিতে হয়। একই ট্রান্সফরমার দ্বিতীয়বার চুরি হলে পুরো দামও গ্রাহকদের বহন করতে হয়। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
জানা গেছে, গত ২ জুলাই থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের আওতাধীন এলাকায় ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ছয়টি, আগস্টে ১৭টি এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে তিনটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়। চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর রাতে বালিজুড়ী ইউনিয়নের সুখনগরী এলাকায় একটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা তামার তারসহ মূল্যবান ধাতুর জন্য এগুলো চুরি করা হচ্ছে। পরে তামার কয়েল খুলে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হতে পারে।
পল্লী বিদ্যুতের তথ্য অনুযায়ী, ৫ কেভিএ ক্ষমতার একটি ট্রান্সফরমারের দাম ৬৩ হাজার ৩৪৫ টাকা, ১০ কেভিএর ৯০ হাজার ১২৫ টাকা, ১৫ কেভিএর ১ লাখ ২ হাজার ৯৮০ টাকা এবং ২৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে ট্রান্সফরমারের অর্ধেক দাম পরিশোধ করাও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদারগঞ্জ পৌরসভার গ্রাবের গ্রাম আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হৃদয় বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ বাসিন্দাই নিম্ন আয়ের। গত ২৯ আগস্ট ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্ধেক টাকা দিতে বলা হয়েছে। টাকা জোগাড় করতে না পারায় প্রকল্পের অন্তত ৪০টি পরিবার এখনো বিদ্যুৎহীন।
জোড়খালী ইউনিয়নের চরগোলাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সেলিম বলেন, গত শুক্রবার রাতে তাদের এলাকার ট্রান্সফরমারটি চুরি হয়েছে। তিন দিন পার হলেও তারা বিদ্যুৎ পাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, লোডশেডিংয়ের সময় ট্রান্সফরমার থেকে কয়েল বা তামার তার খুলে নেওয়া হচ্ছে। লোডশেডিং কখন হবে এবং কতক্ষণ থাকবে, চোরেরা কীভাবে তা নিশ্চিত হচ্ছে- এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক বা বর্তমান কোনো ব্যক্তি এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন বলেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের ডিজিএম সৈয়দা ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, চলতি বছরে ২৮টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এরমধ্যে জানুয়ারিতে দুটি, জুলাইয়ে ছয়টি, আগস্টে ১৭টি এবং সেপ্টেম্বরে তিনটি। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, গত প্রায় দুই মাসে ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। চুরি রোধে টহল বাড়ানো হয়েছে। একটি বিশেষ দলও মাঠে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা বেড়েছে। রাতে টহল বাড়ানোর বিষয়ে থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে। ট্রান্সফরমার চুরি রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও এলাকাবাসীর পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি জানান, ট্রান্সফরমার স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। চুরি প্রতিরোধে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। দীর্ঘ সময়েও চোরচক্রের কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে পুলিশ ও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন।