ময়মনসিংহ মেইল

গৌরীপুরের ৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-15 12:27:05 · স্টাফ রিপোর্টার

শতবছরের স্থায়িত্বের স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত ভবন মাত্র ১০ থেকে ১৫ বছরেই ঝুঁকিপূর্ণ! এ যেন কুড়িতেই বুড়ি হয়ে গেছে প্রত্যেকটি ভবন। শিক্ষার্থীদের ওপর ছাদ আর পলেস্তারা খসে পড়ছে।ফাটল দেখা দিয়েছে দেয়াল ও ছাদে, ভেঙে চৌচির বিম। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফ্লোরও ধসে পড়েছে।কুড়ি বছরেই গচ্ছা গেছে শত কোটি টাকা। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ৩৫ ভবনের নিচে চলছে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কর্মসূচি।

এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা রুবায়াত। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

একেবারে যেসব কক্ষ ক্লাসের অনুপযোগী, সেসব শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে বিকল্প কক্ষে ক্লাস নিতে বলা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৌশল অধিদপ্তরের পার্সেন্টিজ বাণিজ্য আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে এসব ভবন দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে। 

এ প্রসঙ্গে গোবরা গ্রামের আজিজুল হক (৫৫) জানান, ভবনটিতে ঠিকমতো সিমেন্ট দেওয়া হলে এমন হতো না। আর যা করেছিল, যদি নিয়মিত পানি দিতো, তাহলে ভবনটি এত দ্রুত জরাজীর্ণ হয়ে এভাবে পলেস্তারা পড়ে যেতো না।

পাছেরকান্দার আব্দুল হালিম জানান, ভবনগুলো নির্মাণের সময় প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতির কারণেই ভেঙে পড়ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ৩৫ বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে গৌরীপুর পৌর মডেল, মাছুয়াকান্দা, গোলকপুর, জাগরণী, নূতন বাজার, পাছেরকান্দা, আহসানপুর, পানাটি, ভোলারআলগী, কলতাপাড়া, লক্ষীপুর, গুজিখাঁ, বেতান্দর আদর্শ সংসদ, পশ্চিমপাড়া, সহনাটী, ভালুকাপুর, টেঙ্গাপাড়া, লাটুরপায়ার, শাহাবাজপুর, বহেড়াতলা, নিজমাওহা, চড়াকোনা, সিংরাউন্দ, শাহগঞ্জ, ধারাকান্দি, কিল্লাতাজপুর, চল্লিশা কড়েহা, কাশিয়ারচর, লংক্ষাখোলা, মরিচালী, গোবরা, মহিশ্বরণ, বারুয়ামারী, বেরাটি আজমত আলী ও শেখ খমির উদ্দিন।

উপজেলা প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে বিস্তারিত তার জানা নেই। ওই সময়ের অধিকাংশ ভবন ছিল ব্রিকসের। যে কারণে ভবনগুলো দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

জাগরণী পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানজিদা ইয়াসমিন জানান, প্রথম ভবনটি ১৯৮২ সালে নির্মিত, যা একেবারে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১১ সালে চার কক্ষের নির্মিত ভবনটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিমও ফেটে গেছে। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে।

মাছুয়াকান্দা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তার জানান, ভবনটিতে একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদান দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

গোলকপুর পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্যাসিফ্লোরা সুলতানা জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে ২০০৩ সালে দ্বিতীয় ভবনটি নির্মাণ হয়। দোতলার কাজ হয় ২০১০ সালে। পিডিবি-২-এর অধীনে এ কাজ সম্পন্ন হয়। 

তিনি জানান, ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস করা হচ্ছে।

নূতন বাজার পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহসিনা ফিরদাউস জানান, ভবনের যেখানেই ঘষা দেবেন পলেস্তারা পড়তে থাকবে। এই বিমটা পুরোটা ফেটে গেছে। বারান্দার একাধিক স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। পাঠদান নিয়ে খুব সমস্যায় আছি। বারান্দায় চলছে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের ক্লাস। এক কক্ষে নিতে হচ্ছে দুটি ক্লাস। ভবনটিও ঝুঁকিতে আছে।

অপরদিকে গৌরীপুর পৌর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম মাজহারুল আনোয়ার ফেরদৌস জানান, পুরো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। একাধিক স্থানে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। সিমেন্টের এসব প্রলেপ দিয়ে কোনোভাবে টিকে আছি। দেয়ালে টোকা মারলেই ঝুরঝুর করে পলেস্তারা পড়তে থাকে। প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করা চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছি।

পাছেরকান্দা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঞ্জুমান আরা বেগম জানান, ভবনটি ২০০৭ সালে স্থাপিত হয়েছে। ভবনে একাধিক স্থানে ফাটল। অফিস ও শ্রেণিকক্ষের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়ালের পলেস্তারাও ঠিক নেই।

আহছানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছাম্মাৎ জিন্নাত রেহানা জানান, ২০১০ সালে নতুন ভবনটি হস্তান্তর করা হয়। ছাদের একাধিক স্থানে ফাটল ও পলেস্তারা উঠে যাচ্ছে। বারান্দাসহ শ্রেণিকক্ষের প্রত্যেকটি কক্ষে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পুরো ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

এদিকে পানাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু সাইদ জানান, বিদ্যালয়ের ভবনটি ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে নির্মিত হয়। ভবনটি ৯৯ সালের শেষের দিকে হস্তান্তর করা হয়। দোতলার ফাউন্ডেশন থাকার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় আর দোতলা হয়নি। এখন তো একতলাই ভেঙে যাচ্ছে। কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মাথায় পলেস্তারা পড়ে।

অনুরূপ পরিস্থিতি রয়েছে ভাংনামারী ইউনিয়নের ভোলারআলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক জানান, ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। ছাদের কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্লাস্টার খসে পড়ছে।

লক্ষীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ফকির জানান, দোতলা ফাউন্ডেশনের ভবনটির প্রথম তলা করার পরেই আর ওপরে কাজ করা হয়নি। বিল্ডিংটি ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নির্মিত হয়। মাত্র কয়েক বছরেই ভবনটি এখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

একই অবস্থায় রয়েছে গোবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবনের একটি কক্ষকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে টিনশেডের নির্মিত ভবনে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কদ্দুস জানান, শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের অনুপযোগী, বিমের পলেস্তারা খসে ছাত্রছাত্রীর মাথায় পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় একটি ক্লাস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত