ময়মনসিংহ মেইল

নেত্রকোণায় আধুনিক অডিটোরিয়ামের অভাবে স্থবির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

বৃহত্তর ময়মনসিংহ · 2026-09-15 12:28:47 · স্টাফ রিপোর্টার

একসময় নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল খুব প্রাণচঞ্চল। নিয়মিত নাটক, গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্য সভার আয়োজন করা হতো। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা এসব আয়োজনে অংশ নিতেন। অনেক কবি, সাহিত্যিক আবার এই জেলাকে সাংস্কৃতিক রাজধানীও বলে থাকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। প্রায় ৬৬ বছর আগের জরাজীর্ণ পাবলিক হলেই চলছে কার্যক্রম।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য উপযোগী আধুনিক অডিটোরিয়ামের অভাব। জেলা শিল্পকলা একাডেমিরও নিজস্ব অডিটোরিয়াম নেই। ফলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর একমাত্র ভরসা শহরের পুরোনো জেলা পাবলিক হল। বহু বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ এই ভবনে নেই কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। এর ওপর প্রতিটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়। এতে সীমিত সামর্থ্যের অনেক সংগঠন নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সরে আসছে।

এ বিষয় নিয়ে নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সাধারণ কবি তানভীর জাহান চৌধুরী ও সংস্কৃতিকর্মী এনামুল হক পলাশের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘লোকসংস্কৃতির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত নেত্রকোণায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার মতো একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম নেই-এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। জরাজীর্ণ পাবলিক হল থাকলেও ভাড়া বেশি হওয়ায় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারে না। এতে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

তারা আরও জানান, সাংস্কৃতিক চর্চায় নেত্রকোণা জেলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জন্মদিন উদযাপন করা হয় নেত্রকোণায়। আবার ১৯৬৯ সালে ঢাকার বাইরে সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রথম শাখাও গড়ে ওঠে এই নেত্রকোণা জেলায়।

বর্তমানে জেলায় নাটক, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির চর্চা এবং প্রশিক্ষণ দেয়-এমন সক্রিয় সংগঠনের সংখ্যা ২০টির মতো রয়েছে। যাত্রা ও নাট্যচর্চাতেও নেত্রকোণার রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। পৌর শহরের রেলক্রসিং এলাকায় প্রিন্স বিউটি সাজঘর, আনোয়ারা সাজঘর, বারহাট্টার কংস থিয়েটারসহ কয়েকটি অপেরা এখনো যাত্রা চর্চা করছে।

এদিকে নাট্যচর্চা করছে উদীচী, প্রত্যাশা, কচিকাঁচা থিয়েটার, সৎসঙ্গ থিয়েটার, রঙ্গধনু ও নবনাট্য পরিষদ। এ ছাড়া উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, হায়দার-শেলী স্মৃতি সংগীত বিদ্যালয়, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ঝংকার, অগ্রণ, তৃণযোগ, নেত্রকোণা বাউল সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্যচর্চা করছে। তরুণ শিল্পীদের কয়েকটি ব্যান্ডও আছে। তবে উপযুক্ত মিলনায়তনের অভাবে এসব সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে নেই মিলনায়তন শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় শিল্পকলা একাডেমির পাশেই ছিল একসময় 'মহুয়া অডিটরিয়াম'। ১৯৭৯ সালে পৌরসভার জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে জায়গাটির মালিকানা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি ও পৌরসভার মধ্যে শুরু হয় বিরোধ। এ ঘটনায় আদালতে মামালও হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়াই প্রায় ১৫ বছর আগে সেটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর বিরোধের কারণে সেখানে নতুন কোনো মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়নি।

জেলার আধুনিক মিলনায়তনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকরা স্মারকলিপি, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। অনেক সময় বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরাও বিভিন্ন আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

নেত্রকোণা -২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘জেলায় একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। সরকার সারাদেশে প্রথম ধাপে ১৪টি অডিটোরিয়াম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে নেত্রকোণার অডিটোরিয়ামের নামও রয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত ৬ তলা ফাউন্ডেশনের একটি ভবন করতে পারব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘মোক্তারপাড়া এলাকায় শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ও অর্থায়নে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর জায়গার বিরোধের বিষয়টি সমাধানের কাজ চলছে। পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা হয়েছে এবং আশা করছি খুব দ্রুত জায়গার বিরোধের সমস্যাটি সমাধান হবে।’

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত