হুয়াওয়ের সহযোগিতায় উন্নত চিপ তৈরিতে চীনের নিজস্ব প্রযুক্তি গড়ার উদ্যোগ
টেক মেইল · 2026-09-08 05:39:44 · মেইল ডেস্ক
সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বিদেশি প্রযুক্তির নির্ভরতা কমাতে চীনের উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে। সবচেয়ে উন্নত চিপ তৈরিতে সক্ষম যন্ত্রপাতির বিভিন্ন উপাদান তৈরি করছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা দিচ্ছে তারা।
বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তির বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, চিপ তৈরির লিথোগ্রাফি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে হুয়াওয়ে। পাশাপাশি চীনের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসএমআইসির মতো ফ্যাবগুলোর সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক চুক্তি করতেও সহায়তা করছে তারা। এর মাধ্যমে বিদেশি সরবরাহকারীদের বিকল্প হিসেবে একটি দেশীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে হুয়াওয়ে।
এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাংহাইভিত্তিক চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউলিয়াংশেং। বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি চীনে তৈরি প্রথম উন্নত ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি যন্ত্র তৈরি করেছে।
ইউলিয়াংশেংকে সিকারিয়ার কাছ থেকে আলাদা করে গড়ে তোলা হয়েছে। এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছিল, সিকারিয়ার সঙ্গে হুয়াওয়ের ঘনিষ্ঠ প্রযুক্তিগত ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। তবে সিকারিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছে হুয়াওয়ে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ইউলিয়াংশেংয়ের তৈরি ডিইউভি যন্ত্রটি এসএমআইসিসহ চীনের বিভিন্ন চিপ নির্মাতা এবং হুয়াওয়ের নিজস্ব উৎপাদন লাইনে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ তৈরির জন্য এই যন্ত্র ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রকৌশলীরা যন্ত্রটির সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করায় বর্তমানে তুলনামূলক কম জটিল সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে এটি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
চীনের সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভর হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি এখনো লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর তৈরির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য চীনের স্থানীয় চিপ নির্মাতারা এখনো নেদারল্যান্ডসের এএসএমএলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে প্রজেকশন লেন্স ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আলোর উৎসসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদানের ক্ষেত্রে চীনা বিকল্পগুলো এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
স্থানীয় সরবরাহকারীদের সহায়তা এবং তাদের তৈরি যন্ত্রপাতি বাণিজ্যিক চিপ কারখানায় ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে হুয়াওয়ে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রপাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হওয়ার আগে এসব দেশীয় যন্ত্রকে দীর্ঘ সময় পরীক্ষা ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সফল হলে পশ্চিমা দেশগুলোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনের ঝুঁকিও কমবে।
বার্নস্টেইনের সেমিকন্ডাক্টর বিশ্লেষক লিন কিংইউয়ান বলেন, চীনের ডিইউভি উদ্যোগে হুয়াওয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করছে। শুধু একটি ডিইউভি প্রোটোটাইপ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। এটি এগিয়ে নিতে হাজারো সরবরাহকারী ও ক্রেতাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পুরো উদ্যোগকে সমন্বয় করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় শক্তিও প্রয়োজন।
বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউলিয়াংশেং ১২টি ডিইউভি যন্ত্র তৈরি করার পরিকল্পনা করছে। তবে এএসএমএলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রতিষ্ঠানটির এখনো অনেক পথ বাকি।
উন্নত সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে এএসএমএলের যন্ত্র অপরিহার্য। তবে পশ্চিমা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি চীনে তাদের সবচেয়ে উন্নত যন্ত্রপাতি বিক্রি করতে পারে না।
এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছিল, এসএমআইসি ইউলিয়াংশেংয়ের তৈরি ২৮ ন্যানোমিটারের একটি যন্ত্র পরীক্ষা করছে। পাশাপাশি ‘মাল্টি-প্যাটার্নিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই যন্ত্রের মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটারের চিপ তৈরির চেষ্টা করছে তারা। চিপ তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত ন্যানোমিটারের সংখ্যা যত কম হয়, চিপের প্রজন্ম তত উন্নত বলে বিবেচিত হয়।
ইউলিয়াংশেংয়ের তৈরি যন্ত্রগুলো এএসএমএলের সমমানের উৎপাদন সক্ষমতায় পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগবে। এর জন্য দীর্ঘ সময়ের যাচাই, পরীক্ষা ও সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের স্থানীয় লিথোগ্রাফি যন্ত্র নির্মাতা সাংহাই মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স ইকুইপমেন্টের সহায়তায় ইউলিয়াংশেং একাধিক ডিইউভি প্রোটোটাইপ তৈরি করছে। এর কয়েকটিতে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যগুলোয় স্থানীয়ভাবে তৈরি বিকল্প উপাদান পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ডিইউভি যন্ত্রে প্রায় এক ডজন প্রধান শ্রেণির অধীনে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার যন্ত্রাংশ থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল দুটি ক্ষেত্রে প্রজেকশন লেন্স ও আলোর উৎস চীনা সরবরাহকারীরা এখনো বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে।
বিদেশি প্রযুক্তির ওপর চীনের নির্ভরতা কমাতে বিনিয়োগ করা হুয়াওয়ের করপোরেট ভেঞ্চার শাখা হাবো এবং হুয়াওয়ে-সমর্থিত আরেকটি তহবিল শেনঝেন ইউয়ানঝি শিংহুও দুটি প্রতিষ্ঠানই গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণে কাজ করা সরবরাহকারীদের অর্থায়ন করেছে।
বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই ব্যক্তি জানান, ইউলিয়াংশেং তাদের ডিইউভি যন্ত্রে জার্মানির জাইসের তৈরি প্রজেকশন লেন্স ব্যবহার করে। তবে জাইস জানিয়েছে, তারা শুধু এএসএমএলের কাছেই লিথোগ্রাফি অপটিকস বিক্রি করেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, চীনের দ্বিতীয় পর্যায়ের বাজার থেকে এসব লেন্স সংগ্রহ করা সম্ভব।
হাবো ও শেনঝেন ইউয়ানঝি শিংহুও দুই তহবিলই জাইসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফুজিয়ান ঝিকি ফোটোনিকসে বিনিয়োগ করেছে। অতি-নির্ভুল অপটিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে শেনঝেনের তালিকাভুক্ত অপটিক্যাল ম্যাটেরিয়ালস প্রতিষ্ঠান ক্যাসটেক থেকে আলাদা হয়ে গড়ে ওঠে। ২০২৩ সালে ইউয়ানঝি শিংহুও ১০ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির ৩৭ শতাংশ শেয়ার নেয়।
চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যাসটেকের যাত্রা শুরু। লেজার ব্যবস্থায় ব্যবহৃত অপটিক্যাল ক্রিস্টাল তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি অন্যতম শীর্ষ নির্মাতা। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এএসএমএল ও হুয়াওয়ে তাদের গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে।
ঝিকি অতি-নির্ভুল অপটিক্যাল উপাদান তৈরি করছে। এর মধ্যে জাইসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে তৈরি লেন্সও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের তৈরি এসব উপাদান দেশের প্রধান প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছে।
চীনের নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি তৈরির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো আলোর উৎস। এ ক্ষেত্রে জাপানের গিগাফোটন এবং এএসএমএলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাইমার বর্তমানে প্রধান সরবরাহকারী।
বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক লিন বলেন, এটি চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। আলোর উৎস তৈরি করা সহজ। কিন্তু এত বেশি ক্ষমতায় অত্যন্ত স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে এমন আলোর উৎস তৈরি করা কঠিন।
শিল্প খাতের একাধিক নির্বাহী ডিইউভি যন্ত্রে ব্যবহৃত আলোর উৎস তৈরিতে বেইজিং আরএসএলেজার অপটো-ইলেকট্রনিকসের অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটিও হুয়াওয়ের হাবোর কাছ থেকে বিনিয়োগ পেয়েছে।
প্রকাশ্য নথি অনুযায়ী, সাংহাই মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স ইকুইপমেন্টের তৈরি পুরোনো প্রজন্মের ডিইউভি যন্ত্রের জন্য আলোর উৎস সরবরাহ করেছে আরএসএলেজার। চীনা সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসএমইইর ২৮ ন্যানোমিটার ডিইউভি যন্ত্রের জন্য আলোর উৎস তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে।
তবে এসব প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনো বড় সমস্যা। শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এসএমআইসির মতো শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতারা ইউলিয়াংশেংয়ের ডিইউভি যন্ত্র কিনে পরীক্ষা করলেও উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা এখনো এএসএমএলের যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
চীনে এএসএমএলের বিক্রিও এখনো শক্তিশালী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে যন্ত্র মজুত করার পরও চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির মোট আয়ের এক-পঞ্চমাংশ চীন থেকে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তি জানান, মেমোরি চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটি ও ওয়াইএমটিসি দুটি প্রতিষ্ঠানই এএসএমএলের কাছ থেকে আগামী তিন বছরের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা চালানোর মতো পর্যাপ্ত ডিইউভি যন্ত্র মজুত করেছে।
লিন বলেন, চীনের ডিইউভি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। তবে ফ্যাবগুলোর কাছ থেকে এখনো পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। এএসএমএল আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে টিএসএমসির সঙ্গে সহযোগিতার কারণে।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অনিচ্ছাকৃতভাবে চীনের অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। কারণ এর ফলে দেশটির স্থানীয় চিপ নির্মাতারা চীনা সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে বাধ্য হবে।
লিনের মতে, নিষেধাজ্ঞা যদি স্থানীয় ফ্যাবগুলোকে স্থানীয় ডিইউভি সরবরাহকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে বাধ্য করে, তাহলে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়তে পারে।
সূত্র : দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস