ঘরের তাপমাত্রায় চলবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার, হীরার ত্রুটিই কিউবিট
টেক মেইল · 2026-09-13 06:20:55 · স্টাফ রিপোর্টার
হীরার ক্ষুদ্র ত্রুটিকে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করে ঘরের তাপমাত্রায় চলতে সক্ষম নতুন ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রচলিত কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মতো অতিশীতল পরিবেশের প্রয়োজন ছাড়াই স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এই কম্পিউটার পরিচালনা করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন জার্মানির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যাক্সন কিউর গবেষকেরা।
প্রতিষ্ঠানটির তৈরি এই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ব্যবস্থা হীরার বিশেষ বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এটি প্রচলিত কম্পিউটারের মতো সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েও চালানো সম্ভব।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কিউবিট। প্রচলিত কম্পিউটারে তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক হলো ‘বিট’, যা সাধারণত ০ অথবা ১ মান ধারণ করে। অন্যদিকে, কিউবিট একই সময়ে ০ ও ১ উভয় অবস্থার কোয়ান্টাম সমন্বয় ধারণ করতে পারে। এর ফলে নির্দিষ্ট ধরনের জটিল হিসাব প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় ভিন্ন পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
নতুন এই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের প্রসেসর তৈরিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি হীরা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এসব হীরা পুরোপুরি নিখুঁত নয়। বরং ইচ্ছাকৃতভাবে হীরার কার্বন কাঠামোর মধ্যে বিশেষ ধরনের ত্রুটি তৈরি করা হয়। এই ত্রুটিকে বলা হয় নাইট্রোজেন-ভ্যাকেন্সি বা এনভি সেন্টার।
সহজভাবে বললে, হীরার যে স্থানে একটি কার্বন পরমাণু থাকার কথা, সেখানে একটি নাইট্রোজেন পরমাণু এবং তার পাশেই একটি খালি স্থান তৈরি করা হয়। এই বিশেষ কাঠামোর ইলেকট্রনের ‘স্পিন’ নিয়ন্ত্রণ করে তা কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। লেজার ও মাইক্রোওয়েভ পালসের সাহায্যে এসব কিউবিটকে নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম অবস্থায় নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা সম্ভব।
নাইট্রোজেন-ভ্যাকেন্সি প্রযুক্তি অবশ্য নতুন নয়। এতদিন এই পদ্ধতিতে ১০টির বেশি কিউবিট নিয়ে কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা কঠিন ছিল। স্যাক্সন কিউর দাবি, তারা সেই সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের তৈরি ব্যবস্থায় ১০টির বেশি কিউবিট ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সালফার। গবেষকেরা হীরার মধ্যে নাইট্রোজেন-ভ্যাকেন্সি তৈরির পাশাপাশি সালফারও যুক্ত করেছেন। এতে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রন সরবরাহের পাশাপাশি কিউবিটের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
স্যাক্সন কিউর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মারিয়ুস গ্রুন্ডমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সালফার যুক্ত করার বিষয়টি তাদের প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
স্যাক্সন কিউ জানিয়েছে, ত্রুটি সংশোধনের আগে তাদের কিউবিটের নির্ভুলতা বা ফিডেলিটি ৯৯.৯২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পরে ২২ জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একক কিউবিটের ক্ষেত্রে এই হার ৯৯.৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন গ্রুন্ডমান।
অর্থাৎ প্রতি এক হাজারেরও কম অপারেশনে একটি ত্রুটির পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে এসব ফলাফল এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে অন্যান্য ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সঙ্গে এই প্রযুক্তির সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে আপাতত সতর্কতা প্রয়োজন।
বর্তমানে বহুল আলোচিত কিছু কোয়ান্টাম কম্পিউটার, বিশেষ করে সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিটভিত্তিক ব্যবস্থা, অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় পরিচালনা করতে হয়। এ জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল ক্রায়োজেনিক বা অতিশীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়।
হীরাভিত্তিক এনভি কিউবিটের ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজন নেই। স্যাক্সন কিউর তৈরি সিস্টেম সাধারণ কম্পিউটার র্যাকে স্থাপন করা যায় এবং সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগে চালানো সম্ভব।
বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে এমন ক্ষেত্রে, যেখানে ক্লাউডের মাধ্যমে দূরে থাকা কোয়ান্টাম কম্পিউটারে তথ্য পাঠাতে বেশি সময় লাগে।
যেমন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, রোবট বা অন্যান্য ‘এজ কম্পিউটিং’ ব্যবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সুবিধা পাওয়া গেলে তা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
স্যাক্সন কিউ বর্তমানে র্যাক-মাউন্টেড সিস্টেমে ১২৮ কিউবিট পর্যন্ত ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। আগামী বছর ৫১২ কিউবিটের সংস্করণ সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ১০ হাজার বা তার বেশি কিউবিটে পৌঁছানো।
তবে এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্তমানে একটি চিপে একসঙ্গে মাত্র ৮ থেকে ১৬টি কিউবিট রাখা যায়। ফলে ভবিষ্যতে একই চিপে শত শত বা হাজার হাজার কিউবিট বসানোর মতো ঘন অ্যারে তৈরি করতে হবে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো গতি। গবেষণা অনুযায়ী, প্রচলিত কিছু সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম কম্পিউটার হীরাভিত্তিক এনভি ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত কাজ করতে পারে।
তাই শুধু ঘরের তাপমাত্রায় কাজ করতে পারলেই এই প্রযুক্তি অন্য সব ধরনের কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে ছাড়িয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে ল্যাবের অতিশীতল পরিবেশের বাইরে এনে তুলনামূলক সহজে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হীরার ক্ষুদ্র ‘ত্রুটি’কে কাজে লাগিয়ে সেই পথেই নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: লাইভসায়েন্স